|
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে গাজীপুরের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত
গৌরবোজ্জবল। গাজীপুরের জয়দেবপুরে ছিল ২য় ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সদর দপ্তর ।
ভাওয়াল রাজ প্রাসাদে স্থাপন করা হয় তৎকালীন পাকিস্তানের ২য় ইষ্টবেঙ্গল
রেজিমেন্টের সদর দপ্তর । গাজীপুরে মোঃ সামসুল হকের তত্ত্বাবধানে মোঃ হাবিব
উল্যাহ এবং আ, ক, ম, মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বে ডাঃ সাঈদ বক্ম ভূঁইয়া, আবদুল
বারিক মিয়া, মোঃহয়রত আলী, মোঃনূরুল আনোয়ার, মোঃ শহীদুল্লাহ, মোঃ নুরুল
ইসলাম (ভাওয়াল রত্ন) প্রমুখ আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যান । মরহুম মোঃ
হাবিবউল্লাহ ও আ, ক, ম মোজাম্মেল হকের ব্যবহৃত রানী বিলাস মনি উচ্চ
বিদ্যালয়ের হোস্টেলের কক্ষটি ছিল সংগ্রামের কেন্দ্র বিন্দু । থানা পশু
চিকিৎসক ডাঃ আহমেদ ফজলুর রহমানের বাসভবনে ২রা মার্চ সন্ধ্যায় আন্দোলনের
রূপরেখা প্রণয়ন এবং জয়দেবপুর মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয় । ১৯ মার্চ,
১৯৭১ শুক্রবার ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আরবাব স্বয়ংক্রিয় অসেত্র সজ্জিত হয়ে ১৮
পাঞ্জাব রেজিমেন্টের এক কোম্পানী সৈন্য নিয়ে এই ব্যাটালিয়নকে নিরসত্র করতে
ঢাকা থেকে জয়দেবপুর এসেছিলেন । কিন্তু জয়দেবপুরবাসীর প্রবল প্রতিরোধে এই
প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, যা ছিল পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ
সংগ্রাম । ২১ মার্চ কার্ফু উঠিয়ে নেয়ার পর ২৩ মার্চ বিকেলে জয়দেবপুরে
একটি জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকাবাসীদের উপর পাকহানাদার বাহিনীর
হামলার পর ২৮ ও ২৯ মার্চ চলে রাজবাড়ী ক্যান্টমেন্ট সিপাহী বিদ্রোহ। লুন্ঠণ
করা হয় গাজীপুর অসত্রাগার । নিহত হয় ৩০ জন পাকিস্তানি সৈন্য । ৩১ মার্চ
শ্রীপুরে শুরু হয় সশস্ত্র সংগ্রাম । শ্রীপুরে মুক্তিবাহিনীর সাথে
পাকবাহিনীর যুদ্ধ হয় । ১৭ সেপ্টেমবর মাজুখান পুলে পাঞ্জাবী সৈন্য ও
রাজাকারদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের এক ভয়াবহ বন্দুক ও মাইন বিষ্ফোরণও ঘটানো
হয় । ১৪ অক্টোবর রাতে ধীরাশ্রমে মুক্তিযোদ্ধারা রেললাইন উপড়ে ফেলে এবং
ভোররাতে জয়দেবপুর দক্ষিন সিগন্যাল সংলগ্ন সেতু মাইন বিষ্ফোরণে উড়িয়ে দিয়ে
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ১০-১১ ডিসেমবর গ্রুপ কমান্ডার মোঃ আব্দুল গণি
মোল্লার নেতৃত্বে পূবাইলে পাকহানাদারদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধ হয়। এতে ১০ জন
পাকসেনা নিহত ও ৩ জন বীর মুক্তি যোদ্ধা শহীদ হন। ব্রাষ্ফনবাড়িয়া, কুমিল্লা
এবং নরসিংদী হতে মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট পরাজিত পাকবাহিনী ট্রেনে পূবাইল
পৌঁছলে মুক্তিবাহিনীর আক্রমনের শিকার হয় ১৩ ডিসেমবর । ১৪-১৫ ডিসেমবর
জয়দেবপুর রেল ষ্টেশনের নিকট গোলাগুলির সময় কানাইয়া গ্রামের বীর
মুক্তিযোদ্ধা বদরুজ্জামান খোকন শহীদ হন। ১৫ ডিসেমবর সকালে জয়দেবপুরসহ
আশেপাশের এলাকা দখলদার মুক্ত হয়। তবে ছয়দানায় দেশের সর্ববৃহৎ এবং সর্বশেষ
যুদ্ধ শুরু হয় যা ১৬ ডিসেমবর সকাল পর্যন্ত চলে যুদ্ধে পাকহানাদার বাহিনীরসকলেই নিহত হয়।মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গাজীপুরে বেশ কয়েকটি গণহত্যা সংঘটিত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল জয়দেবপুর গণহত্যা, ইছরকান্দি গণহত্যা, শ্রীপুর গণহত্যা, শ্রীপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ক্যাম্পাস গণহত্যা, সমরাসত্র কারখানা নির্যাতন ও গণহত্যা এবং বাড়িয়া গণহত্যা । মুক্তিযুদ্ধে গাজীপুরে শহীদ হন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা তাদের মধ্যে রয়েছেন আবদুল বাতেন আকন্দ, আব্দুস সামাদ, মোঃ বাচ্ছু মিয়া, সুনীল, বাদশা, হরমত, মনুমিয়া, মাজেদ মিয়া, আবুল হোসেনসহ আরো অনেকে । |
|
|
|
|
||